Type Here to Get Search Results !

বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সংকট: অবহেলা ও অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ

 


দক্ষিণ দিনাজপুর:- দুই দিনাজপুর জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বাংলার মাটিতে লুকিয়ে থাকা অতীতের অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অবহেলা, অযত্ন এবং সরকারি উদ্যোগের অভাবে ধ্বংসের পথে। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর ও কুশমন্ডি ব্লক এবং উত্তর দিনাজপুর জেলার ইটাহার ব্লকের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। অতীত সভ্যতার শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহনকারী এই নিদর্শনগুলি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।


দক্ষিণ দিনাজপুর হেরিটেজ সোসাইটির সভাপতি তুহিন শুভ্র মণ্ডল জানান, এই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের অভাবে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি দ্রুত চিহ্নিত এবং সংরক্ষণ করা হোক। এগুলি সংরক্ষণ করতে পারলে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য প্রকাশিত হবে।” তুহিন শুভ্র মণ্ডল আরও জানান, হেরিটেজ সোসাইটি দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি সনাক্তকরণ এবং সংরক্ষণের জন্য কাজ করে আসছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের অভাবে তাদের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।



প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি অতীতের বস্তুগত ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করে। এগুলি কেবল অতীতের গৌরবের কথা বলে না, বরং ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচনের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনে এই নিদর্শনগুলির ভূমিকা অপরিসীম। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলির মধ্যে রয়েছে শিলালিপি, যা প্রাচীন ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক কার্যকলাপের পরিচায়ক; সৌধ ও স্মৃতিস্তম্ভ, যা স্থাপত্যশৈলী এবং সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতীক; মুদ্রা ও লিপি, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিত্তি; এবং ভাস্কর্য ও চিত্রকলা, যা শিল্প ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল নিদর্শন।


বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির অবহেলার প্রধান কারণ হলো সরকারি উদ্যোগের অভাব এবং স্থানীয় জনগণের উদাসীনতা। সরকারি নজরদারির অভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের জন্য তহবিল বরাদ্দ এবং রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। স্থানীয় জনগণের অসচেতনতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কৃষিকাজ, এবং পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবও এই সংকটকে গভীরতর করেছে।



বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষায় একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা জরুরি। স্থানীয় জনগণকে নিদর্শনগুলির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাদের সংরক্ষণের কাজে যুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালনা করে নিদর্শনগুলির ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হলে সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নেও সাহায্য হবে। একই সঙ্গে, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির সুরক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করা দরকার।


প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি আমাদের অতীতের অমূল্য পরিচয় বহন করে। এগুলির সংরক্ষণ শুধু আমাদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের সজীব দলিল হিসেবেও কাজ করবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে এই মহামূল্যবান সম্পদকে রক্ষা করতে। যদি এখনই এই নিদর্শনগুলির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া না হয়, তবে অচিরেই আমরা ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ চিরতরে হারিয়ে ফেলব। বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

Tags

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Top Side